বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশই এখন তরুণ। আর তরুণরাই পারে একটি দেশের অর্থনীতির গতি পরিবর্তন করতে। মোট জনসংখ্যার ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা এখন বেশি, যা জনসংখ্যার প্রায় ৩২ শতাংশ (উৎসঃ CIA - The World Factbook)। ২০১৫ - ২০১৬ সালের মধ্যে এটা ৪০ শতাংশে উন্নীত হবে। কোনো দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যখন আনুপাতিক হারে সবচেয়ে বেশি থাকে তখন তাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (Demographic Dividend) বা ডেমোগ্রাফিক বোনাস (Demographic Bonus) বলে। এ অবস্থাকে আবার উইন্ডোজ অব অপরচুনিটিও (Windows of Opportunity) বলা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে কোনো দেশের উন্নয়নের সম্ভাবনাময় দুয়ার খুলে যেতে পারে। আর যদি সঠিক সময়ে তাদের সঠিকভাবে কাজে লাগানো না যায় তাহলে তা যেকোনো দেশের জন্য বোঝা ও মারাত্মক বিপদের কারণ হবে। বাংলাদেশের এই শিক্ষিত বিপুল কর্মক্ষম জনগণকে অনলাইনে আউটসোর্সিং কাজের যোগ্য হিসেবে অথবা ফ্রিল্যান্সার হিসাবে গড়ে তোলা অন্যতম ফলপ্রসু সমাধান হতে পারে।আউটসোর্সিং (Outsourcing) হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ নিজেরা না করে বাইরের কোন প্রতিষ্ঠানের বা ব্যক্তির সাহায্যে করিয়ে নেয়া। এই কাজ হতে পারে কোনো প্রকল্পের অংশ বিশেষ অথবা সমগ্র প্রকল্প। ফ্রিল্যান্সিং (Freelancing) হচ্ছে যখন কোন ব্যক্তি কোন নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ না করে চুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাজ করে থাকেন। একজন ফ্রিল্যান্সারের যেরকম রয়েছে কাজের ধরণ নির্ধারণের স্বাধীনতা, তেমনি রয়েছে যখন ইচ্ছা তখন কাজ করার স্বাধীনতা। গতানুগতিক অফিস সময়ের মধ্যে ফ্রিল্যান্সার স্বীমাবদ্ধ নয়। কোম্পানিগুলো সাধারণত আউটসোর্সিং করে উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য। অনেক সময় পর্যাপ্ত সময়, শ্রম অথবা প্রযুক্তির অভাবেও আউটসোর্সিং করা হয়। মূলত তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর কাজগুলো (যেমন - Web Development, Software Development, Writing & Content, Design, Multimedia & Architecture, SEO/SEM/SMM, Data Entry ইত্যাদি) আউটসোর্সিং করা হয়। যেসকল দেশ এই ধরনের সার্ভিস প্রদান করে থাকে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ভারত, ইউক্রেন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ফিলিপিন, রাশিয়া, পাকিস্তান, পানামা, নেপাল, বাংলাদেশ, রোমানিয়া, মালয়েশিয়া, মিশর এবং আরো অনেক দেশ।
ফ্রিল্যান্সিং-এর ইতিহাস
বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং-এর ইতিহাস খুব বেশি পুরানো নয়। গত তিন-চার বছরে এই পেশা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে ফ্রিল্যান্সিং-এর ধারণাটি আগে থেকেই ছিল। এর সুচনা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। "GURU" –সর্বপ্রথম ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস যা ১৯৯৮ সালে SOFTmoonlighter.com হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় পরে Elance.com, RentAcoder.com, Odesk.com, GetAFreelancer.com, Freelancer.com, Limeexchange.com সহ আরো অনেক মার্কেটপ্লেস প্রতিষ্ঠিত হয়। ইন্টারনেটের বিস্তৃতির কারনে বাংলাদেশেও ফ্রিল্যান্সিং দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
ফ্রিল্যান্সিং কাজ যেভাবে হয়
যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি (Employer) তার কোনো কাজ আউটসোর্সিং করাতে চান, তাহলে তিনি ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে এসে সেই কাজটির জন্য ফ্রিল্যান্সারদের কাছ থেকে বিড (Bid) আমন্ত্রন করেন। একটি বিডের মধ্যে একজন ফ্রিল্যান্সার উল্লেখ করেন যে তিনি কত দিনের মধ্যে কাজটি শেষ করতে পারবেন, এজন্য তার পারিশ্রমিক কত হবে। এভাবে একটি কাজের যে কয়টি বিড হয় সেগুলোর মধ্য থেকে সবচেয়ে যোগ্য এবং সুবিধাজনক বিডটিকে Employer নির্বাচন করেন। এরপর সেই ফ্রিল্যান্সারের সাথে তিনি যোগাযোগ করেন এবং কাজের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। কাজ শেষে বিভিন্ন পদ্ধতিতে পে-মেন্ট করা হয় যা "টাকা তুলবেন কিভাবে" অংশে বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ফ্রিল্যান্সিং করার পূর্বশর্ত
ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার জন্য কোনো একটি বিষয়ে দক্ষতা থাকা জরুরী। তার সাথে আপনার ইন্টারনেট ব্যবহারের উপরেও ভালো জ্ঞান থাকতে হবে। তবে আপনার যদি কম্পিউটারের একাধিক বিষয়ে দক্ষতা থাকে, তাহলে স্বভাবতই আপনি বড় পরিধিতে কাজ করতে পারবেন। আপনার ক্লায়েন্টদের বেশিরভাগই হবেন অবাঙ্গালী, সুতরাং তাদের সাথে আপনার ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে হবে। তারা Skype বা অন্য মেসেঞ্জার সার্ভিসের মাধ্যমে আপনার ইন্টারভিউ নিতে পারেন। তাই ইংরেজির ওপর ভালো দখল থাকা খুবই গুরূত্বপূর্ণ।
কিভাবে শুরু করবেন
একজন ক্লায়েন্ট আপনাকে তখনই কাজ দেবেন, যখন তিনি আপনার প্রোফাইল দেখে সন্তুষ্ট হবেন, এবং আপনি যেই অ্যামাউন্ট বিড করবেন তা তার মনঃপুত হবে। সুতরাং সবার প্রথমেই আপনাকে এমন একটি সুন্দর ও গোছানো প্রোফাইল বানাতে হবে যা দেখে যেকোন ব্যক্তি আপনার সাথে কাজ করতে আগ্রহী হবেন। একই সাথে আপনি বিভিন্ন মার্কেটপ্লেস ঘুরে দেখুন, সেগুলোর চাহিদা সম্পর্কে জানুন এবং আপনার প্রোফাইল সেই অনুযায়ী গড়ে তুলুন।একটি ভালো প্রোফাইল বানাতে হলে আপনাকে যা করতে হবে:
- নিজেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ করে তুলুন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সাহায্য পাবেন সার্চ ইঞ্জিন (যেমন Google, Bing, Yahoo ইত্যাদি) এবং বিভিন্ন ভিডিও টিউটোরিয়াল থেকে। এছাড়া দেশে প্রচুর ট্রেনিং সেন্টার আছে, সেগুলো থেকে কিছু বেসিক ট্রেনিং নিতে পারেন। তবে শুধু ট্রেনিং সেন্টারগুলোর উপর নির্ভর করলেই হবে না, এগিয়ে যেতে গেলে আপনাকে নিজে থেকেই কাজ সম্পর্কিত অনেক কিছু শিখতে হবে।
- আপনার দক্ষতা অনুযায়ী কিছু কাজ তৈরী করুন। যেমন, আপনি যদি ওয়েব ডিজাইনিং এ দক্ষ হয়ে থাকেন, তাহলে কিছু ওয়েব পেইজ বানান, সেগুলো আপনার মার্কেটপ্লেসের প্রোফাইলে দেখান। আবার আপনি যদি লেখালেখি বা ফটোগ্রাফীর কাজে পারদর্শী হন তাহলে সেগুলোর কিছু নমুনা আপনার প্রোফাইলে রাখুন।
- ODesk.com, Freelancer.com, elance.com ইত্যাদি ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে দক্ষতা পরিমাপের পরীক্ষা দেওয়া যায়। এগুলো দেওয়া জরুরী। যার যত বেশি পরীক্ষা দেওয়া থাকে তার কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়।
- আপনার প্রোফাইল এবং দক্ষতাগুলো শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ছাড়াও অন্যান্য জায়গা – যেমন বন্ধুমহল, সামাজিক যোগাযোগের সাইট, ব্লগিং সাইট অথবা ফোরামগুলোতে শেয়ার করুন।
ফ্রিল্যান্সিং কাজ যেভাবে হয়
যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি (Employer) তার কোনো কাজ আউটসোর্সিং করাতে চান, তাহলে তিনি ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে এসে সেই কাজটির জন্য ফ্রিল্যান্সারদের কাছ থেকে বিড (Bid) আমন্ত্রন করেন। একটি বিডের মধ্যে একজন ফ্রিল্যান্সার উল্লেখ করেন যে তিনি কত দিনের মধ্যে কাজটি শেষ করতে পারবেন, এজন্য তার পারিশ্রমিক কত হবে। এভাবে একটি কাজের যে কয়টি বিড হয় সেগুলোর মধ্য থেকে সবচেয়ে যোগ্য এবং সুবিধাজনক বিডটিকে Employer নির্বাচন করেন। এরপর সেই ফ্রিল্যান্সারের সাথে তিনি যোগাযোগ করেন এবং কাজের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। কাজ শেষে বিভিন্ন পদ্ধতিতে পে-মেন্ট করা হয় যা "টাকা তুলবেন কিভাবে" অংশে বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ক্লায়েন্ট পাবেন কিভাবে
একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ফ্রিল্যান্সারগণ সবচেয়ে বেশি কাজ পান অন্য কারো রেফারেন্সের মাধ্যমে। আপনার যদি পরিচিত এমন কেউ না থাকেন যিনি আপনাকে রেফার করতে পারেন, তাহলে সুন্দর প্রোফাইল বানিয়ে, সঠিক টাকা বিড/ আওয়ারলী রেট নির্ধারণ করে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করুন। প্রথম কাজ পাওয়াটা অনেক ক্ষেত্রেই ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল। আপনি ৩ দিনেও কাজ পেতে পারেন, আবার ৩ মাস-ও লেগে যাতে পারে। এটি আপনার ধৈর্যের একটি বড় পরীক্ষা।একবার কাজ পেয়ে গেলে, সেই কাজটি মন দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে শেষ করুন। এতে ক্লায়েন্ট খুশি হয়ে আপনাকে ভালো ফিডব্যাক দেবেন। পরবর্তীতে আপনি এই ক্লায়েন্টের কাছ থেকেই নতুন কাজ পেতে পারেন।
কি কাজ করবেন
ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে আপনার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন কাজ পেতে পারেন। সহজ কাজগুলোর মধ্যে আছে Search Engine Optimization, Article writing, Data Entry ইত্যাদি। স্বভাবতই কাজগুলো যেহেতু সহজ, সেহেতু এগুলোতে বিডিং হয় সবচেয়ে বেশি এবং এগুলো সহসা পাওয়াও দুষ্কর। এগুলোর চাইতে একটু কঠিন কাজ হল Web Development, Product Development, Software Development, Graphics Designing ইত্যাদি। কঠিন কাজগুলোতে সহজ কাজের চাইতে পে-মেন্ট বেশি থাকে।আপনি কোন্ কাজটি করবেন সেটি নির্ভর করে আপনি কোন্ কাজে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং মার্কেটপ্লেসে তার চাহিদা কেমন। সবসময় এই দুটো বিষয়ের ওপর ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করুন।আপনার কাজটি কতটা জটিল, এটি সম্পন্ন করতে কত সময় লাগবে এবং অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে রেট নির্ধারিত হয়। ফিক্সড পেমেন্টের কাজগুলো ৩০ ডলার থেকে শুরু করে ১০০০ বা তারও বেশি ডলারের হয়।
কিভাবে বিড করবেন
প্রধানত দুই প্রকারে বিডিং করা হয়ঃ
- Project Fee: কোনো একটি প্রজেক্ট যখন মার্কেটপ্লেসে দেওয়া হয়, তখন আপনি পুরো প্রজেক্টটি সম্পন্ন করতে কত পারিশ্রমিক নিবেন তা নিয়ে বিডিং করতে পারেন।
- Hourly Rate: এই পদ্ধতিতে আপনি কোনো একটি প্রজেক্টের জন্য কাজ করতে প্রতি ঘন্টায় কত পারিশ্রমিক নেবেন, তা নিয়ে বিড করতে পারেন।
Comments
Post a Comment